Last Updated on November 10, 2025 by বিডি কিক
বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশেই জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার জন্য একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী রয়েছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, পৃথিবীতে কিছু দেশ আছে যেখানে সেনাবাহিনী নেই। এই দেশগুলো নিজস্ব সামরিক বাহিনী ছাড়াই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে টিকে আছে, শান্তিপূর্ণভাবে জীবনযাপন করছে। প্রশ্ন হলো, কীভাবে সম্ভব এটা? তারা কীভাবে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে? এই প্রবন্ধে আমরা বিশদভাবে আলোচনা করবো সেই দেশগুলোর সম্পর্কে, যেখানে কোনো সেনাবাহিনী নেই, এবং জানবো তাদের ইতিহাস, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও জীবনযাত্রার ধরন।
কেন কিছু দেশে সেনাবাহিনী নেই
সেনাবাহিনী একটি দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার অন্যতম স্তম্ভ। তবুও, কিছু দেশ সেনাবাহিনী রাখে না বিভিন্ন কারণে — যেমন রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা, শান্তিপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি, অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা বা আন্তর্জাতিক চুক্তির প্রভাব। এসব দেশের নিরাপত্তা অনেক ক্ষেত্রে অন্য দেশ বা আন্তর্জাতিক চুক্তির ওপর নির্ভরশীল। উদাহরণস্বরূপ, কিছু দেশ প্রতিরক্ষা চুক্তির মাধ্যমে অন্য শক্তিশালী দেশ থেকে নিরাপত্তা সেবা পায়।
১. নিরপেক্ষ নীতি
যেসব দেশ যুদ্ধ বা সংঘাত থেকে দূরে থাকতে চায়, তারা নিজেদের নিরপেক্ষ ঘোষণা করে এবং সেনাবাহিনী রাখে না। এই নীতির মূল উদ্দেশ্য হলো আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শান্তিপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখা।
২. অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা
একটি পূর্ণাঙ্গ সেনাবাহিনী পরিচালনা করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। ছোট জনসংখ্যা বা দুর্বল অর্থনীতির দেশগুলো অনেক সময় এই খরচ বহন করতে পারে না। তাই তারা সেনাবাহিনী গঠন না করে সেই অর্থ শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও উন্নয়ন খাতে ব্যয় করে।
৩. আন্তর্জাতিক চুক্তি ও রক্ষা ব্যবস্থা
অনেক দেশ আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় থাকে, যার মাধ্যমে অন্য দেশ তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। ফলে তাদের নিজস্ব সেনাবাহিনীর প্রয়োজন হয় না।
যেসব দেশে সেনাবাহিনী নেই
বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ২০টির মতো দেশ ও অঞ্চল রয়েছে যেখানে কোনো সেনাবাহিনী নেই। এদের মধ্যে কিছু স্বাধীন রাষ্ট্র, আবার কিছু নির্ভরশীল অঞ্চল। নিচে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য দেশের তথ্য তুলে ধরা হলো:
১. কোস্টা রিকা (Costa Rica)
লাতিন আমেরিকার এই দেশটি ১৯৪৮ সালে গৃহযুদ্ধের পর তাদের সেনাবাহিনী বিলুপ্ত করে। তারপর থেকে কোস্টা রিকা শান্তি, শিক্ষা এবং পরিবেশ রক্ষায় বিনিয়োগ করছে। দেশটি জাতিসংঘের অন্যতম শান্তিপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত।
২. আইসল্যান্ড (Iceland)
উত্তর ইউরোপের এই দ্বীপ দেশটির কোনো স্থায়ী সেনাবাহিনী নেই। তবে তারা ন্যাটো সদস্য হওয়ায়, যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশ তাদের প্রতিরক্ষা দায়িত্ব পালন করে। দেশটিতে শুধুমাত্র কোস্ট গার্ড ও পুলিশের বিশেষ ইউনিট রয়েছে।
৩. পানামা (Panama)
১৯৮৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের পর পানামা তাদের সেনাবাহিনী বাতিল করে দেয়। এখন সেখানে জাতীয় পুলিশ বাহিনী অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
৪. লিশটেনস্টাইন (Liechtenstein)
ইউরোপের ছোট্ট এই দেশটি ১৮৬৮ সালে সেনাবাহিনী বাতিল করে দেয়। প্রয়োজনে তারা প্রতিবেশী সুইজারল্যান্ডের ওপর নির্ভর করে নিরাপত্তার জন্য।
৫. ভ্যাটিকান সিটি (Vatican City)
বিশ্বের ক্ষুদ্রতম রাষ্ট্র ভ্যাটিকান সিটিতে কোনো সেনাবাহিনী নেই। পোপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে সুইস গার্ড, যা মূলত সুইজারল্যান্ডের নাগরিকদের নিয়ে গঠিত।
৬. মোনাকো (Monaco)
ফ্রান্সের তত্ত্বাবধানে থাকা এই রাজ্যটির নিজস্ব সেনাবাহিনী নেই। দেশটির প্রতিরক্ষা দায়িত্ব ফ্রান্স পালন করে।
৭. সান মারিনো (San Marino)
ইতালির ভিতরে অবস্থিত সান মারিনোও সেনাবাহিনী ছাড়া বিশ্বের প্রাচীনতম প্রজাতন্ত্রগুলোর একটি। এদের ছোট একটি সম্মানসূচক গার্ড ইউনিট আছে, তবে তা সামরিক বাহিনী নয়।
৮. পালাউ (Palau)
ওশেনিয়ার দ্বীপ দেশ পালাউ ১৯৯৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি করে। যুক্তরাষ্ট্রই তাদের সামরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
৯. মার্শাল দ্বীপপুঞ্জ (Marshall Islands)
এই দেশটিও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তিতে আবদ্ধ। ফলে তাদের কোনো নিজস্ব সেনাবাহিনী নেই।
১০. মাইক্রোনেশিয়া (Micronesia)
এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের এই ছোট দেশটিও যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছায়াতলে রয়েছে। তারা নিজস্ব সামরিক বাহিনী গঠন করেনি।
কীভাবে এসব দেশ নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে
সেনাবাহিনী না থাকলেও এই দেশগুলো নিরাপত্তাহীন নয়। তারা বিভিন্ন উপায়ে নিজেদের রক্ষা করে—
১. প্রতিরক্ষা চুক্তি
অনেক দেশ অন্য শক্তিশালী দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি করে। এতে কোনো আক্রমণ হলে সেই শক্তিশালী দেশ সাহায্য করে। যেমন—কোস্টা রিকার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র, আর আইসল্যান্ডের ক্ষেত্রে ন্যাটো।
২. শক্তিশালী পুলিশ ও কোস্ট গার্ড
এই দেশগুলোতে পুলিশ বাহিনী অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে। তারা অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং জরুরি প্রতিরক্ষা পরিস্থিতি সামলায়।
৩. আন্তর্জাতিক সহযোগিতা
জাতিসংঘ, ন্যাটো বা আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংস্থার সদস্য হিসেবে এসব দেশ বিশ্ব শান্তি ও সহযোগিতার নীতিতে বিশ্বাস করে। তারা কূটনৈতিক সমঝোতা এবং আন্তর্জাতিক আইনের ওপর নির্ভর করে।
সেনাবাহিনীহীন দেশগুলোর সুবিধা ও অসুবিধা
সুবিধা
- সরকারি বাজেটে সামরিক ব্যয় কমে যায়।
- সেই অর্থ শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামোতে ব্যয় করা যায়।
- আন্তর্জাতিকভাবে শান্তিপূর্ণ ভাবমূর্তি তৈরি হয়।
অসুবিধা
- আন্তর্জাতিক সংঘাতে আত্মরক্ষার সীমাবদ্ধতা থাকে।
- অন্য দেশের ওপর নির্ভরশীলতা তৈরি হয়।
- অভ্যন্তরীণ সঙ্কটে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেওয়া কঠিন হতে পারে।
কোথায় সেনাবাহিনী নেই — এই বিষয়ে মানুষের সাধারণ কৌতূহল
১. এই দেশগুলো কি যুদ্ধের সময় নিরাপদ?
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তারা আন্তর্জাতিক চুক্তির কারণে নিরাপদ থাকে। বড় দেশগুলো তাদের রক্ষা করে এবং জাতিসংঘও তাদের পক্ষে অবস্থান নেয়।
২. এসব দেশে কি পুলিশ বাহিনী আছে?
হ্যাঁ, সেনাবাহিনী না থাকলেও প্রতিটি দেশে শক্তিশালী পুলিশ বা নিরাপত্তা বাহিনী থাকে যারা অভ্যন্তরীণ শান্তি বজায় রাখে।
৩. সেনাবাহিনী না থাকলে জাতীয় দিবসে কীভাবে সম্মান প্রদর্শন করে?
সাধারণত পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও নাগরিক সংগঠনগুলো জাতীয় দিবসের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে।
৪. এসব দেশে কি কখনো যুদ্ধ হয়েছে?
কিছু দেশে (যেমন কোস্টা রিকা) অতীতে যুদ্ধ হয়েছে, তবে পরবর্তীতে তারা স্থায়ীভাবে শান্তি বেছে নিয়েছে।
৫. ভবিষ্যতে কি এসব দেশ সেনাবাহিনী গঠন করতে পারে?
তাত্ত্বিকভাবে সম্ভব হলেও বাস্তবে তাদের অধিকাংশই শান্তিপূর্ণ নীতি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর নির্ভর করতে চায়।
উপসংহার
পৃথিবীতে যেখানে যুদ্ধ আর সংঘাত প্রতিনিয়ত বাড়ছে, সেখানে সেনাবাহিনীহীন দেশগুলোর অস্তিত্ব এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তারা প্রমাণ করেছে যে শান্তি ও সহযোগিতার মাধ্যমে নিরাপত্তা বজায় রাখা সম্ভব। কোথায় সেনাবাহিনী নেই—এই প্রশ্নের উত্তর শুধু কৌতূহল নয়, এটি মানব সভ্যতার এক ইতিবাচক বার্তাও বটে। আমরা যদি তাদের নীতিগুলো থেকে শিক্ষা নিই, তবে বিশ্ব আরও শান্তিপূর্ণ হতে পারে।
👉 আপনি কি জানতেন? এই দেশগুলোর অধিকাংশে অপরাধের হার অত্যন্ত কম, আর নাগরিকরা বিশ্বের সুখী জনগণের তালিকায় শীর্ষে! তাই যুদ্ধ নয়, শান্তিই হতে পারে উন্নয়নের সবচেয়ে বড় অস্ত্র।