ট্রেড লাইসেন্স এর মালিকানা পরিবর্তন — সম্পূর্ণ নির্দেশিকা ও প্রয়োজনীয় ধাপসমূহ

Last Updated on November 11, 2025 by বিডি কিক

ট্রেড লাইসেন্স এর মালিকানা পরিবর্তন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, যা ব্যবসার আইনগত মালিকানা হালনাগাদ করতে অপরিহার্য। অনেক সময় ব্যবসা বিক্রয়, পার্টনারশিপ পরিবর্তন, বা মালিক মৃত্যুর কারণে লাইসেন্সের নাম পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়। সঠিক নিয়মে কাজ না করলে ভবিষ্যতে আইনি জটিলতা বা জরিমানার মুখোমুখি হতে পারেন।

এই নিবন্ধে আপনি জানবেন — কীভাবে ট্রেড লাইসেন্স এর মালিকানা পরিবর্তন করবেন, কী কাগজপত্র লাগবে, কোথায় আবেদন করতে হবে, এবং প্রক্রিয়াটি কতদিন সময় নেয়।

ট্রেড লাইসেন্স এর মালিকানা পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা

বাংলাদেশে প্রতিটি ব্যবসার জন্য ট্রেড লাইসেন্স একটি বাধ্যতামূলক নথি। এটি প্রমাণ করে যে ব্যবসাটি স্থানীয় সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভার অনুমোদনে পরিচালিত হচ্ছে। যখন ব্যবসার মালিক পরিবর্তন হয়, তখন পুরোনো মালিকের নামে থাকা লাইসেন্স বৈধ থাকে না। এজন্য ট্রেড লাইসেন্স এর মালিকানা পরিবর্তন করা জরুরি।

এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করলে ব্যাংক হিসাব, টেন্ডার আবেদন, কর পরিশোধ, কিংবা অন্যান্য ব্যবসায়িক কার্যক্রমে সমস্যা দেখা দিতে পারে।

মালিকানা পরিবর্তনের মূল কারণ

১. ব্যবসা বিক্রয় বা হস্তান্তর

যখন একজন উদ্যোক্তা তার ব্যবসা অন্য কাউকে বিক্রি বা হস্তান্তর করেন, তখন নতুন মালিকের নামে ট্রেড লাইসেন্স এর মালিকানা পরিবর্তন করতে হয়। এটি আইনগতভাবে নতুন মালিকের অধিকার নিশ্চিত করে।

২. পার্টনারশিপ পরিবর্তন

ব্যবসায়িক অংশীদারদের মধ্যে কোনো পরিবর্তন হলে, লাইসেন্সে সেই পরিবর্তন প্রতিফলিত করতে হয়। এটি ব্যবসার স্বচ্ছতা ও কর প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

৩. মালিকের মৃত্যু

মূল মালিক মৃত্যুবরণ করলে উত্তরাধিকারীকে লাইসেন্স হালনাগাদ করতে হয়। এই অবস্থায় প্রমাণপত্র হিসেবে মৃত্যু সনদ ও উত্তরাধিকার সনদ জমা দিতে হয়।

ট্রেড লাইসেন্স এর মালিকানা পরিবর্তনের ধাপসমূহ

মালিকানা পরিবর্তনের প্রক্রিয়াটি কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হয়। নিচে তা বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হলো:

১. আবেদনপত্র সংগ্রহ ও পূরণ

আপনাকে প্রথমে সংশ্লিষ্ট সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভা অফিস থেকে নির্ধারিত ফরম সংগ্রহ করতে হবে। ফরমে পুরোনো ও নতুন মালিকের তথ্য, ব্যবসার ঠিকানা, এবং পরিবর্তনের কারণ উল্লেখ করতে হয়।

২. প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত

ট্রেড লাইসেন্স এর মালিকানা পরিবর্তনের জন্য নিম্নলিখিত কাগজপত্র সাধারণত প্রয়োজন হয়:

  • পুরোনো ট্রেড লাইসেন্সের কপি
  • ন্যাশনাল আইডি (NID) এর ফটোকপি (পুরোনো ও নতুন মালিকের)
  • ভ্যাট ও ট্যাক্স সার্টিফিকেট
  • ব্যবসা হস্তান্তর চুক্তিপত্র বা বিক্রয় রসিদ
  • দুইজন সাক্ষীর স্বাক্ষরিত দলিল
  • নতুন মালিকের ছবি (২ কপি)

৩. আবেদন জমা ও ফি পরিশোধ

সব কাগজপত্র প্রস্তুত করার পর আবেদনপত্রসহ সংশ্লিষ্ট অফিসে জমা দিতে হবে। সাধারণত ট্রেড লাইসেন্স এর মালিকানা পরিবর্তন ফি ২০০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে হয়ে থাকে, তবে এলাকা অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে।

৪. যাচাই ও অনুমোদন

কর্মকর্তারা আপনার তথ্য যাচাই করবেন। সবকিছু ঠিক থাকলে নতুন মালিকের নামে ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু করা হবে। সাধারণত ৫–৭ কার্যদিবস সময় লাগে।

অনলাইন আবেদন প্রক্রিয়া

বর্তমানে অনেক সিটি কর্পোরেশন যেমন ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ইত্যাদি অনলাইন সেবায় ট্রেড লাইসেন্স প্রদান করছে। আপনি চাইলে অনলাইনেও ট্রেড লাইসেন্স এর মালিকানা পরিবর্তন আবেদন করতে পারেন।

প্রক্রিয়াটি নিম্নরূপ:

  1. সিটি কর্পোরেশনের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে যান।
  2. অনলাইন ট্রেড লাইসেন্স পোর্টালে লগইন করুন।
  3. “Ownership Change” অপশনটি নির্বাচন করুন।
  4. ফরম পূরণ করে প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট আপলোড করুন।
  5. ফি পরিশোধ করে সাবমিট করুন।

কতদিনে মালিকানা পরিবর্তন সম্পন্ন হয়?

সাধারণভাবে, যদি সব কাগজপত্র সঠিক থাকে, তাহলে ট্রেড লাইসেন্স এর মালিকানা পরিবর্তন প্রক্রিয়া ৫ থেকে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে সম্পন্ন হয়। তবে অফিসের ব্যস্ততা বা তথ্য ঘাটতির কারণে কিছুটা সময় বাড়তে পারে।

সাধারণ ভুল ও সতর্কতা

  • অসম্পূর্ণ ফরম জমা দেওয়া
  • ভুল NID বা ব্যবসার ঠিকানা
  • পুরোনো বকেয়া ফি না পরিশোধ করা
  • সাক্ষী সঠিকভাবে যুক্ত না করা

এই ভুলগুলো এড়াতে, আবেদন জমা দেওয়ার আগে সব তথ্য ও কাগজপত্র ভালোভাবে যাচাই করুন।

মালিকানা পরিবর্তনের পর যা করতে হবে

ট্রেড লাইসেন্স এর মালিকানা পরিবর্তন সম্পন্ন হওয়ার পর আপনাকে নতুন লাইসেন্স কপিটি সংরক্ষণ করতে হবে। এছাড়া, ব্যাংক একাউন্ট, ট্যাক্স সার্টিফিকেট, এবং অন্যান্য সরকারি নথিতেও নতুন মালিকের নাম হালনাগাদ করতে হবে।

ট্রেড লাইসেন্স এর মালিকানা পরিবর্তনের উপকারিতা

নতুন মালিকের নামে লাইসেন্স হালনাগাদ করলে ব্যবসায়িক লেনদেনে স্বচ্ছতা আসে। এটি আইনগত সুরক্ষা প্রদান করে এবং ব্যবসার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় সুবিধা দেয়।

তাছাড়া, সরকারের কাছে সঠিক তথ্য সংরক্ষিত থাকায় বিভিন্ন প্রণোদনা বা সুযোগ গ্রহণেও সুবিধা হয়।

FAQ

প্রশ্ন: ট্রেড লাইসেন্স এর মালিকানা পরিবর্তনের জন্য কী কী কাগজপত্র লাগে?
উত্তর: পুরোনো লাইসেন্স কপি, NID, ট্যাক্স সার্টিফিকেট, ব্যবসা হস্তান্তর দলিল, সাক্ষীর সই এবং নতুন মালিকের ছবি প্রয়োজন।

প্রশ্ন: অনলাইনে কি ট্রেড লাইসেন্স এর মালিকানা পরিবর্তন করা যায়?
উত্তর: হ্যাঁ, বর্তমানে বেশিরভাগ সিটি কর্পোরেশনের ওয়েবসাইটে অনলাইন আবেদন করার সুযোগ রয়েছে।

প্রশ্ন: প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে কতদিন লাগে?
উত্তর: সাধারণত ৫ থেকে ১০ কার্যদিবস সময় লাগে, তবে কাগজপত্র যাচাইয়ের উপর নির্ভর করে।

প্রশ্ন: পুরোনো বকেয়া থাকলে কি পরিবর্তন সম্ভব?
উত্তর: না, পুরোনো বকেয়া ফি পরিশোধ না করলে আবেদন গৃহীত হয় না।

প্রশ্ন: আবেদন ফি কত?
উত্তর: সাধারণত ২০০–৫০০ টাকার মধ্যে, সিটি কর্পোরেশন ভেদে ভিন্ন হতে পারে।

প্রশ্ন: মৃত্যুবরণ করা মালিকের লাইসেন্স কীভাবে হালনাগাদ হবে?
উত্তর: উত্তরাধিকারীরা মৃত্যু সনদ ও উত্তরাধিকার সনদসহ আবেদন করতে পারেন।

প্রশ্ন: মালিকানা পরিবর্তনের পর কী করতে হবে?
উত্তর: নতুন লাইসেন্স হাতে পাওয়ার পর ব্যাংক একাউন্ট, ট্যাক্স নথি এবং অন্যান্য সরকারি রেকর্ডে মালিকের নাম হালনাগাদ করতে হবে।

উপসংহার

ট্রেড লাইসেন্স এর মালিকানা পরিবর্তন একটি সহজ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। এটি সম্পন্ন করলে ব্যবসা পরিচালনা আইনগতভাবে বৈধ থাকে এবং ভবিষ্যতের ঝুঁকি কমে। তাই সঠিক নিয়মে আবেদন করে নতুন মালিকের নামে লাইসেন্স হালনাগাদ করুন।

যদি আপনি ট্রেড লাইসেন্স এর মালিকানা পরিবর্তন সংক্রান্ত পরামর্শ বা সহায়তা চান, তাহলে আপনার স্থানীয় সিটি কর্পোরেশন অফিসে যোগাযোগ করুন অথবা নিকটস্থ পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সাহায্য নিন।

Spread the love

Leave a Comment