বাংলাদেশে সর্বশেষ গণভোট অনুষ্ঠিত হয় কোন সালে: ইতিহাস ও বিশ্লেষণ

বাংলাদেশে সর্বশেষ গণভোট অনুষ্ঠিত হয় কোন সালে? এই প্রশ্নটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস, গণতন্ত্র ও সংবিধান সংশোধনের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ মানুষের মনে এটি একটি প্রাকৃতিক প্রয়াস—জানতে, কখন দেশে সর্বশেষ নাগরিক মতামত যাচাইয়ের জন্য গণভোট হয়েছিল এবং সেই সিদ্ধান্ত দেশের রাজনৈতিক পথচলায় কী প্রভাব ফেলেছে। ঐতিহাসিক এবং রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ডের আলোকে এই প্রবন্ধে আমরা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব।

গণভোট কী এবং কেন তা গুরুত্বপূর্ণ?

গণভোট হলো একটি সরাসরি ভোট পদ্ধতি যেখানে দেশের সকল যোগ্য ভোটার একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে “হ্যাঁ” বা “না” বলে তাঁদের মতামত প্রকাশ করে। সাধারণ নির্বাচন থেকে এটি আলাদা, কারণ এখানে প্রার্থী বা দল নেই; বরং একটি নির্দিষ্ট প্রস্তাব বা নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে জনগণ সরাসরি সিদ্ধান্ত দেয়। বিশ্ব রাজনীতিতে গণভোট একটি গণতান্ত্রিক যন্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়, বিশেষ করে সংবিধান সংশোধন বা গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে।

বাংলাদেশে গণভোটের ইতিহাস

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের ইতিহাসে মোট তিনবার গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। এগুলোর প্রেক্ষাপট, উদ্দেশ্য এবং ফলাফল ভিন্ন। সাধারণত রাজনৈতিক সংকট বা বৃহৎ সাংবিধানিক পরিবর্তনের সময় এই গণভোটগুলো সংগঠিত হয়।

১. ১৯৭৭ সালের গণভোট

বাংলাদেশে প্রথম গণভোট ১৯৭৭ সালের ৩০ মে অনুষ্ঠিত হয়। এটি ছিল একটি প্রশাসনিক গণভোট, যেখানে তখনকার প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের শাসনের বৈধতা যাচাইয়ের জন্য জনগণের কাছে “হ্যাঁ” বা “না” ভোটের মাধ্যমে মতামত নেওয়া হয়েছিল।

২. ১৯৮৫ সালের গণভোট

দ্বিতীয়বারের মত ১৯৮৫ সালের ২১ মার্চে রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের জনসমর্থন যাচাইয়ের জন্য প্রশাসনিক গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। এই গণভোটেও জনগণ “হ্যাঁ” বা “না” ভোটের মাধ্যমে তাদের অবস্থান ব্যক্ত করে।

৩. ১৯৯১ সালের গণভোট

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য এবং সাংবিধানিক পর্যায়ের গণভোট ছিল ১৯৯১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত গণভোটটি। এখানে মূল বিষয় ছিল বাংলাদেশের সংবিধানে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন—রাষ্ট্রপথ থেকে সংসদী ব্যবস্থায় পুনরায় শক্ত ভিত্তি স্থাপন। নির্বাচকদের সামনে প্রশ্ন ছিল “Should or not the President assent to the Constitution (Twelfth Amendment) Bill, 1991?” অর্থাৎ, ১৯৯১ সালের ১২তম সংশোধনী বিলকে রাষ্ট্রপতি অনুমোদন করবেন কি করবেন না।

এই প্রস্তাবটি স্বীকৃত হয় এবং ৮৪ শতাংশের বেশি ভোট “হ্যাঁ” আসে, এবং বাংলাদেশ পুনরায় সংসদীয় শাসন ব্যবস্থায় ফিরে আসে। এই গণভোট ছিল বাংলাদেশের সর্বশেষ গণভোট, যেখানে সংবিধান সংশোধনের বিষয়ে সাধারণ ভোটারের মতামত সরাসরি নেওয়া হয়েছিল।

১৯৯১ সালের গণভোটের সমাজ-রাজনৈতিক প্রভাব

১৯৯১ সালের গণভোট শুধুই একটি ভোটাভুটি ছিল না; এটি ছিল একটি রাজনৈতিক পুনর্গঠনের মুহূর্ত। এর প্রভাব সামগ্রিক রাজনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী হয়। প্রথমত, এটি সংসদীয় গণতন্ত্রের মূল স্তম্ভগুলোর স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনে এবং কার্যকরভাবে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী ব্যবস্থার মধ্যে ক্ষমতা বিভাজন নিশ্চিত করে। দ্বিতীয়ত, এটি দেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে একটি যৌথ প্রেক্ষাপটে পুনর্বিন্যস্ত করার সুযোগ দেয়। অনেক অভিজ্ঞ বিশ্লেষক মনে করেন, এই গণভোটের ফলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে মৌলিক প্রচলিত গণতান্ত্রিক মানদণ্ড বজায় রয়েছে।

গণভোট এবং সংবিধান: বাংলাদেশের সংবিধানে এ বিষয়ে কী বলা আছে?

বাংলাদেশের সংবিধানে সরাসরি গণভোটের বিষয়ে নির্দিষ্ট বিধান নেই। তবে সাংবিধানিক সংশোধনী বা গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সর্বসম্মতিক্রমে জনগণের মতামত নেওয়ার ধারণা একটি গণতান্ত্রিক অনুশীলন হিসেবে চর্চিত হয়ে এসেছে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব নিয়ে আবারও গণভোটের ভাবনা উঠে এসেছে।

সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট: ২০২৬ সালের সম্ভাব্য গণভোট

২০২৫ সালের শেষের দিকে রাজনৈতিক কর্মসূচির অংশ হিসেবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালে জাতীয় সংসদের নির্বাচনের পাশাপাশি একটি নতুন সাংবিধানিক গণভোটের সম্ভাবনা রয়েছে, যেখানে “জুলাই জাতীয় সনদ” সম্পর্কিত সংবিধান সংস্কার প্রস্তাবের বিষয়ে সরাসরি জনগণের মতামত নেওয়া হবে। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে দীর্ঘদিন পর অনুষ্ঠিত হতে পারে এমন একটি গণভোট—যা ১৯৯১ সালের পর সর্ব প্রথম বড় আকারের গণভোটের উদ্যোগ।

বাংলাদেশে সর্বশেষ গণভোট কখন হয়েছিল?

উপরে আলোচিত ইতিহাস অনুযায়ী, বাংলাদেশে সর্বশেষ গণভোট অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর। এটি একটি সাংবিধানিক গণভোট ছিল এবং দেশের সংবিধান সংশোধনের বিষয়ে সাধারণ ভোটারের মতামত নেওয়ার জন্য অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এই ভোটের ফলাফল পরবর্তীতে বাংলাদেশকে পুনরায় সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা গ্রহণে সাহায্য করে।

সংশোধনী ও ভবিষ্যত দিক

যদিও ১৯৯১ সালের গণভোটই এখন পর্যন্ত সর্বশেষ বাস্তবায়িত গণভোট, নতুন রাজনৈতিক ও সংবিধানগত পরিবর্তনের আলোচনায় আবারও গণভোটের প্রস্তাব সামনে এসেছে। এটি দেখায় যে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে জনগণের সরাসরি মতামত নেওয়ার প্রথা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

গণতন্ত্র ও নাগরিক অংশগ্রহণের ভবিষ্যৎ দিক নিয়ে আলোচনার সময় বাংলাদেশের ১৯৯১ সালের গণভোট অন্যতম মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয় এবং এটি যেভাবে দেশের রাজনৈতিক কাঠামো পরিবর্তনে ভূমিকা রেখেছে তা ইতিহাসে স্মরণীয়। বাংলাদেশে সর্বশেষ গণভোট অনুষ্ঠিত হয় কোন সালে জানাই ১৯৯১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর।

Spread the love

Leave a Comment