গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত পেটে ব্যথা হলে করণীয় বিষয়টি অনেক সময় গর্ভবতী নারী, তাদের পরিবার এবং পরিচর্যাকারীর মধ্যে উদ্বেগ, বিভ্রান্তি এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করে। কারণ গর্ভাবস্থার ব্যথা কখন স্বাভাবিক, আর কখন জরুরি পরিস্থিতির সিগন্যাল—এই দুইয়ের পার্থক্য বোঝা সহজ নয়। তাই এই গাইডে আমরা বিশদভাবে আলোচনা করবো: কোন ধরনের ব্যথা স্বাভাবিক, কোনগুলো বিপজ্জনক, কীভাবে লক্ষণ থেকে ঝুঁকি বোঝা যায়, করণীয় কী হতে পারে, কখন দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে, এবং কীভাবে নিরাপদে ব্যথা প্রতিরোধ করা যায়।
গর্ভাবস্থায় পেটে ব্যথা কেন হয়
গর্ভাবস্থায় জরায়ু বড় হয়, হরমোন পরিবর্তন ঘটে, পেটের অর্গানগুলোর অবস্থান পরিবর্তন হয়, ফলে স্বাভাবিকভাবেই অস্বস্তি বা ব্যথা হতে পারে। তবে সব ব্যথা একই রকম নয়। ব্যথার ধরন, অবস্থান, স্থায়িত্ব, অন্যান্য লক্ষণ—এসব দেখে ব্যথার ধরন নির্ণয় করতে হয়। বাস্তবে দেখা যায়, অনেক পরিবার বা পরিচর্যাকারী ব্যথার ধরণ নিয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নেয়, যার ফল মারাত্মক হতে পারে।
স্বাভাবিক ব্যথা এবং এর কারণ
নীচে এমন কিছু ব্যথার ধরন দেওয়া হলো যেগুলো সাধারণত বিপজ্জনক নয় এবং অধিকাংশ গর্ভবতী নারীর ক্ষেত্রে দেখা যায়:
- Round Ligament Pain: জরায়ুর আশপাশের লিগামেন্ট টান ধরলে তীক্ষ্ণ ব্যথা লাগতে পারে। সাধারণত ডান বা বাম দিকে বেশি অনুভূত হয়।
- Constipation বা গ্যাস: খাবারের পরিবর্তন, হরমোনাল পরিবর্তন ও অন্ত্রের গতি কমে যাওয়ার কারণে গ্যাস বা কোষ্ঠকাঠিন্যজনিত ব্যথা হতে পারে।
- False Contraction (Braxton Hicks): অনিয়মিত এবং স্বল্পস্থায়ী সংকোচন যা প্রসবের আগে আগে বেশি হয়।
- Baby Movement: শিশুর নড়াচড়া শক্ত হলে পেটে খোঁচা লাগার মতো ব্যথা অনুভূত হতে পারে।
স্বাভাবিক ব্যথা সাধারণত দীর্ঘস্থায়ী হয় না, রক্তপাত হয় না এবং জ্বর, মাথা ঘোরা বা অস্বাভাবিক তরল নির্গমন থাকে না। তবে ব্যথা যদি বারবার হয় বা সন্দেহজনক মনে হয়, চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করা উচিত।
বিপজ্জনক বা জরুরি ব্যথা এবং এর সম্ভাব্য কারণ
গর্ভাবস্থায় অনেক ধরনের ব্যথা জীবনঝুঁকিপূর্ণ ইঙ্গিতও দিতে পারে। এসব বিষয়ে অবহেলা করা বিপজ্জনক। নিচে কিছু সম্ভাব্য কারণ উল্লেখ করা হলো:
- Ectopic Pregnancy: ডিম্বাণু জরায়ুর বাইরে স্থাপন হলে তীব্র ব্যথা, কাঁধে ব্যথা, মাথা ঘোরা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
- Placental Abruption: প্লাসেন্টা আলাদা হয়ে গেলে পেট শক্ত হয়ে যায়, রক্তপাত হয়, তীব্র ব্যথা হয় এবং শিশুর জীবনঝুঁকি তৈরি হয়।
- Appendicitis: পেটের ডান পাশে তীব্র ব্যথা, জ্বর, বমি—এই ধরনের লক্ষণ দেখা দিলে জরুরি চিকিৎসা দরকার।
- Gallbladder বা Kidney Stone: পিঠ থেকে সামনের দিকে তীব্র ব্যথা, প্রস্রাবে জ্বালা, রক্ত ইত্যাদি দেখা গেলে স্টোন সন্দেহ করা হয়।
- Preterm Labor: ৩৭ সপ্তাহের আগে নিয়মিত contraction, রক্তপাত বা পানি বের হওয়া—এগুলো পূর্বপ্রসবের ইঙ্গিত দেয়।
- Urinary Tract Infection (UTI): প্রস্রাবে জ্বালা, জ্বর, পেটের নিচে ব্যথা—এগুলো ইঙ্গিত দেয়। চিকিৎসা না নিলে কিডনি পর্যন্ত ছড়িয়ে যেতে পারে।
কখন বুঝবেন ব্যথাটা জরুরি
গর্ভাবস্থায় নিম্নোক্ত লক্ষণগুলোর যেকোনোটি থাকলে দ্রুত হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যেতে হবে:
- তীব্র, ধারাবাহিক বা লাগাতার ব্যথা
- রক্তপাত বা পানির মতো তরল বের হওয়া
- জ্বর, কাঁপুনি বা অতিরিক্ত দুর্বলতা
- শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার প্রবণতা
- শিশুর নড়াচড়ায় পরিবর্তন বা কমে যাওয়া
- পেট শক্ত হয়ে থাকা বা ব্যথার সাথে পিঠে টান লাগা
ঘরে বসে নিরাপদে কী করতে পারেন
প্রথমেই মনে রাখতে হবে, গর্ভাবস্থায় নিজে নিজে ওষুধ খাওয়া বিপজ্জনক। চিকিৎসকের অনুমতি ছাড়া ব্যথানাশক বা অন্য ওষুধ নয়। তবে নিম্নোক্ত কিছু নিরাপদ পদক্ষেপ ব্যথা কমাতে সাহায্য করতে পারে:
- বিশ্রাম নিন: অতিরিক্ত হাঁটাচলা, কাজ বা মানসিক চাপ ব্যথা বাড়াতে পারে।
- হালকা গরম সেঁক: খুব বেশি গরম নয়, হালকা উষ্ণ সেঁক দেওয়া যেতে পারে (জরায়ু অঞ্চলে সরাসরি নয়)।
- পানি পান করুন: পানিশূন্যতা (Dehydration) ব্যথা বাড়াতে পারে, তাই পর্যাপ্ত পানি পান জরুরি।
- হালকা খাবার খান: গ্যাস বা কোষ্ঠকাঠিন্য থাকলে ফাইবার ও পানিযুক্ত খাবার উপকারী।
- শরীরের ভঙ্গি ঠিক রাখুন: পাশে কাত হয়ে শোয়া (Left lateral) রক্ত প্রবাহের জন্য ভালো।
- স্ট্রেস কমান: মেডিটেশন বা শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম সাহায্য করতে পারে।
কোন ওষুধ নিতে পারবেন এবং কোনগুলো নয়
চিকিৎসক না বললে ব্যথানাশক ওষুধ যেমন Ibuprofen, Diclofenac বা Aspirin গর্ভাবস্থায় অনেক সময় ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। সাধারণত চিকিৎসকের পরামর্শে Paracetamol নিরাপদ করা হয়। তবে ওষুধ একটি ব্যক্তিগত চিকিৎসা সিদ্ধান্ত—তাই চিকিৎসককে না জিজ্ঞেস করে কিছুই নেবেন না।
হাসপাতালে কী পরীক্ষা করা হতে পারে
যদি ব্যথা অস্বাভাবিক মনে হয়, চিকিৎসক নিম্নোক্ত পরীক্ষা করতে পারেন:
- Ultrasound (USG)
- Urine Test
- Blood Test
- CTG (Child monitoring)
- Pelvic examination
এসব পরীক্ষার লক্ষ্য হলো প্লাসেন্টার অবস্থা, সংক্রমণ, স্টোন, শিশুর নড়াচড়া, জরায়ুর সংকোচন ইত্যাদি শনাক্ত করা।
ব্যথা কমানোর জন্য খাদ্যাভ্যাস ও জীবনধারা
একটি সুস্থ খাদ্যাভ্যাস গর্ভাবস্থায় ব্যথা কমাতে ও জটিলতা প্রতিরোধে সহায়ক। নিচে কিছু নির্দেশনা:
- ফাইবার সমৃদ্ধ সবজি ও ফল খাওয়া
- প্রচুর পানি পান
- অল্প অল্প করে বারবার খাওয়া
- গ্যাস উৎপন্ন করে এমন খাবার সীমিত করা
- অতিরিক্ত তৈলাক্ত খাবার এড়িয়ে চলা
এছাড়া গর্ভাবস্থায় নিয়মিত হালকা হাঁটা, শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
চিকিৎসকের সাথে দেখা করার আগে প্রস্তুতি
অনেক গর্ভবতী নারী চিকিৎসকের কাছে গেলে কী বলবেন তা নিয়ে দ্বিধায় থাকেন। বাস্তবে লক্ষণগুলো সঠিকভাবে বললে চিকিৎসক দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তাই নোট করে রাখুন:
- ব্যথা কখন শুরু হয়েছে
- ব্যথা কোথায় ও কেমন (তীক্ষ্ণ, মৃদু, ছড়ানো ইত্যাদি)
- সাথে কি রক্তপাত, জ্বর, বমি, মাথা ঘোরা আছে
- শিশুর নড়াচড়া কমেছে কি না
- আগে এমন ব্যথা হয়েছিল কি না
এই তথ্যগুলো চিকিৎসা সিদ্ধান্তে অনেক সহায়ক।
বিপজ্জনক ভুলগুলো যেগুলো এড়িয়ে চলা উচিত
গর্ভাবস্থায় ব্যথা হলে অনেকেই ভুলভাবে কিছু কাজ করেন, যা ঝুঁকি বাড়ায়:
- নিজে নিজে ব্যথানাশক খাওয়া
- বাড়িতে বসে বহুদিন অপেক্ষা করা
- “স্বাভাবিক” ধরে ব্যথা উপেক্ষা করা
- ইন্টারনেটের ভুল তথ্য দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া
- চিকিৎসকের কাছে পুরো তথ্য না বলা
প্রতিরোধ: কী করলে ব্যথার ঝুঁকি কমবে
ব্যথা কমানোর জন্য প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপগুলো:
- নিয়মিত ANC (Antenatal Checkup)
- পর্যাপ্ত পানি পান
- স্বাস্থ্যকর খাবার
- প্রেসক্রাইবড আয়রন, ক্যালসিয়াম ও মাল্টিভিটামিন
- স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণ
- নিয়মিত হালকা ব্যায়াম
বাংলাদেশে ANC অনেক সময় গুরুত্ব পায় না, ফলে সমস্যা ধরা পড়ে দেরিতে। তাই পরিবার ও স্বামী-স্ত্রী উভয়ের সচেতনতাও গুরুত্বপূর্ণ।
অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতা: পরিবার ও সমাজের ভূমিকা
বাংলাদেশে অনেক গর্ভবতী নারী সামাজিক নিয়ম, পরিবারের চাপে বা চিকিৎসা সম্পর্কে ভুল ধারণার কারণে সময়মতো চিকিৎসা নেন না। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে গ্যাস বা কোষ্ঠকাঠিন্য ভেবে গুরুতর ব্যথা অবহেলা করা হয়। পরিবারের উচিত গর্ভবতী নারীর ব্যথা বা উপসর্গকে হালকাভাবে না দেখা ও সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করা।
বিশ্বস্ত মেডিকেল তথ্য কোথায় পাওয়া যায়
ভুল পরামর্শ এড়াতে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য তথ্যের উৎস ব্যবহার করা উচিত, যেমন:
- World Health Organization (WHO): https://www.who.int
- Mayo Clinic: https://www.mayoclinic.org
বাংলায় স্বাস্থ্য জেনে নিতে আপনি Edu Poribar এবং প্রাসঙ্গিকভাবে মাতৃস্বাস্থ্য সংক্রান্ত পোস্টগুলো থেকেও ধারণা নিতে পারেন। একইভাবে, খাদ্য ও জীবনধারা সম্পর্কিত সহায়ক পোস্টগুলো আপনি আমাদের BoiAche.com ওয়েবসাইটেও খুঁজে পেতে পারেন, যা বিষয়গত নলেজ বাড়াতে সহায়ক।
উপসংহার
গর্ভাবস্থায় ব্যথা স্বাভাবিক হলেও অতিরিক্ত বা অস্বাভাবিক ব্যথা কখনোই অবহেলা করা উচিত নয়। মা এবং শিশুর সুস্থতা নিশ্চিত করতে শরীরের সংকেতগুলো বুঝতে হবে, প্রয়োজন হলে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে এবং ক্ষতিকর ওষুধ বা সিদ্ধান্ত এড়িয়ে চলতে হবে। সর্বোপরি, নিরাপদ গর্ভকালীন যত্ন, নিয়মিত চেকআপ, সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং মানসিক স্থিরতা সুস্থ প্রসবের সম্ভাবনা বাড়ায়। তাই গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত পেটে ব্যথা হলে করণীয় সম্পর্কে সচেতন থাকা প্রতিটি গর্ভবতী নারী এবং পরিবারের দায়িত্ব।