গর্ভাবস্থায় হিমোগ্লোবিন কমে যাওয়া বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে গর্ভবতী নারীদের মধ্যে একটি অত্যন্ত সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) অনুযায়ী, পৃথিবীর প্রায় ৪০% গর্ভবতী নারী কোনো না কোনোভাবে অ্যানিমিয়া বা রক্তস্বল্পতায় ভোগেন, এবং এর মধ্যে অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রধান কারণ হলো আয়রনের ঘাটতি। গর্ভাবস্থায় একজন নারীর শরীরে অক্সিজেন ও পুষ্টি পরিবহনের জন্য রক্তের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। ফলে শরীরকে নতুন রক্ত তৈরি করতে হয় এবং সেই রক্তে যথেষ্ট হিমোগ্লোবিন থাকা জরুরি। যদি শরীর এই অতিরিক্ত চাহিদা পূরণ করতে না পারে, তবে স্বাভাবিকভাবেই হিমোগ্লোবিনের মাত্রা কমে যায় এবং বিভিন্ন শারীরিক জটিলতা দেখা দেয়।
এই বিশেষ বিষয়টি বোঝা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ গর্ভাবস্থায় হিমোগ্লোবিন কমে গেলে এটি শুধুমাত্র মায়ের স্বাস্থ্যে নয়, শিশুর বৃদ্ধি ও জীবনের মানেও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। তবে ভালো খবর হলো এই সমস্যাটি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রতিরোধযোগ্য এবং চিকিৎসাযোগ্য। এজন্য প্রয়োজন সচেতনতা, পুষ্টি সম্পর্কে জ্ঞান, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং সময়মতো চিকিৎসা।
হিমোগ্লোবিন কী এবং কেন এটি জরুরি
হিমোগ্লোবিন হলো এক ধরনের লৌহসমৃদ্ধ প্রোটিন, যা আমাদের রক্তের লাল কণিকায় (Red Blood Cells বা RBC) থাকে। এই প্রোটিনের প্রধান কাজ হলো ফুসফুস থেকে অক্সিজেন সংগ্রহ করা এবং তা শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ, কোষ এবং টিস্যুতে পৌঁছে দেওয়া। একইভাবে এটি কার্বন ডাই–অক্সাইড পুনরায় ফুসফুসে পৌঁছে দিতে সাহায্য করে, যাতে তা নিঃশ্বাসের মাধ্যমে বের হয়ে যায়।
গর্ভাবস্থায় হিমোগ্লোবিনের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে তিনটি দিক থেকে:
- মাতৃস্বাস্থ্য: পর্যাপ্ত হিমোগ্লোবিন থাকলে মায়ের শরীরে ক্লান্তি কম থাকে, হৃদস্পন্দন স্বাভাবিক থাকে এবং শ্বাসপ্রশ্বাসে কোনো অতিরিক্ত চাপ পড়ে না।
- ভ্রূণের বৃদ্ধি: হিমোগ্লোবিন কমে গেলে শিশুর কাছে পর্যাপ্ত অক্সিজেন ও পুষ্টি পৌঁছায় না, ফলে তার শারীরিক ও স্নায়বিক বিকাশ ব্যাহত হতে পারে।
- প্রসবকালীন নিরাপত্তা: গর্ভবতী নারীরা প্রসবের সময় কিছু পরিমাণ রক্ত হারান। যদি আগে থেকেই হিমোগ্লোবিন কম থাকে, তাহলে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ প্রাণঘাতী পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
এ কারণেই গর্ভধারণের শুরু থেকে প্রসব পরবর্তী সময় পর্যন্ত হিমোগ্লোবিন পর্যবেক্ষণ চিকিৎসাবিজ্ঞানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
গর্ভাবস্থায় হিমোগ্লোবিন কমে যাওয়ার প্রধান কারণগুলো
গর্ভবতী নারীর শরীরে হিমোগ্লোবিন কমে যাওয়ার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। এগুলোর মধ্যে কিছু সাধারণ ও প্রতিরোধযোগ্য এবং কিছু আবার স্বাস্থ্যগত জটিলতার কারণে হয়ে থাকে।
১) আয়রনের ঘাটতি (Iron Deficiency Anemia)
গর্ভাবস্থায় আয়রনের ঘাটতি বিশ্বের সবচেয়ে বড় সমস্যা। WHO তথ্য অনুযায়ী, গর্ভবতী নারীদের মধ্যে অ্যানিমিয়ার ৭০% এরও বেশি ক্ষেত্রে কারণ হলো আয়রনের ঘাটতি। কারণগুলো হলো:
- খাদ্যে আয়রনের পরিমাণ কম থাকা
- প্রাণিজ খাদ্য কম খাওয়া
- বারবার বমি হওয়া
- চা ও কফি অতিরিক্ত খাওয়া (যা আয়রন শোষণ কমায়)
- অর্থনৈতিকভাবে সীমাবদ্ধতা
আয়রন ঘাটতি হলে শরীর পর্যাপ্ত RBC তৈরি করতে পারে না, ফলে অ্যানিমিয়া দেখা দেয়।
২) ফলিক অ্যাসিডের ঘাটতি (Folate Deficiency)
ফলিক অ্যাসিড (Vitamin B9) RBC তৈরিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গর্ভাবস্থায় ফলিক অ্যাসিডের চাহিদা অনেক বেড়ে যায়, কারণ এটি শিশুর স্নায়ুবিক টিউব গঠনে সাহায্য করে। অনেক নারী পর্যাপ্ত ফলিক অ্যাসিড না খাওয়া বা সাপ্লিমেন্ট না নেওয়ার কারণে হিমোগ্লোবিন কমে যায়।
৩) ভিটামিন B12 ঘাটতি
Vitamin B12 মাংস, ডিম, দুধ ইত্যাদিতে পাওয়া যায়। যারা প্রাণিজ খাদ্য কম খান বা একেবারেই না খান, তাঁদের ক্ষেত্রে ভিটামিন B12 ঘাটতি বেশি দেখা যায়। Vitamin B12 ঘাটতি RBC এর আকার ও উৎপাদন দুইটাই ব্যাহত করে।
৪) অতিরিক্ত বমি বা Hyperemesis Gravidarum
গর্ভাবস্থার প্রথম দিকে বহু নারী বমি ও বমিভাব অনুভব করেন। বমির কারণে:
- পানিশূন্যতা
- পুষ্টি ঘাটতি
- খাবারের প্রতি অনীহা
ইত্যাদি সমস্যা তৈরি হয়, যা RBC উৎপাদনে বাধা দেয়।
৫) ক্রনিক রোগ বা ইনফেকশন
কিছু দীর্ঘস্থায়ী রোগ যেমন:
- TB
- কিডনি সমস্যা
- থাইরয়েড সমস্যা
- ম্যালেরিয়া
- পরজীবী বা Worm Infestation
শরীরে প্রদাহ সৃষ্টি করে এবং অ্যানিমিয়া তৈরি করতে পারে।
৬) রক্তক্ষরণ বা Hemorrhage
পূর্ববর্তী মাসিক, পাইলস, আলসার অথবা প্লাসেন্টার জটিলতার কারণে রক্তক্ষরণ হলে হিমোগ্লোবিন কমে যায়।
হিমোগ্লোবিন কমে গেলে যে লক্ষণগুলো দেখা যায়
লক্ষণগুলো ধীরে ধীরে বা হঠাৎ দেখা দিতে পারে। সাধারণত দেখা যায়:
- অল্প কাজেই ক্লান্তি বা অবসাদ
- মাথা ঘোরা
- হৃদস্পন্দন বৃদ্ধি
- শ্বাসকষ্ট
- মনোযোগ কমে যাওয়া
- ঠোঁট বা নখ ফ্যাকাশে হওয়া
- হাত-পা ঠান্ডা লাগা
- ঘুম বেড়ে যাওয়া
- খাবারে অনীহা
অনেক নারী ভাবেন, এসব স্বাভাবিক গর্ভকালীন উপসর্গ — কিন্তু এগুলো আসলে RBC বা অক্সিজেন কমে যাওয়ার সংকেত।
হিমোগ্লোবিন কমে গেলে মা ও শিশুর জন্য ঝুঁকি
১) মায়ের জন্য ঝুঁকি
- প্রসব-পূর্ব রক্তক্ষরণ
- প্রসব-পরবর্তী Hemorrhage
- হৃদযন্ত্রের জটিলতা
- সংক্রমণের ঝুঁকি বৃদ্ধি
- দুর্বলতা ও মানসিক চাপ
- শ্বাসকষ্ট
২) শিশুর জন্য ঝুঁকি
- কম ওজন নিয়ে জন্ম (Low Birth Weight)
- প্রি-ম্যাচিওর জন্ম
- স্নায়ুবিক বিকাশে সমস্যা
- অক্সিজেন ঘাটতি
- প্রসূতিমৃত্যুর ঝুঁকি
- শিশুমৃত্যুর ঝুঁকি (চরম ক্ষেত্রে)
কিভাবে হিমোগ্লোবিন পরীক্ষা করা হয়
হিমোগ্লোবিন নির্ণয়ের জন্য CBC (Complete Blood Count) পরীক্ষা করা হয়। WHO গাইডলাইন অনুযায়ী, গর্ভাবস্থায় Hb < 11 g/dl হলে অ্যানিমিয়া ধরা হয়।
গর্ভাবস্থায় হিমোগ্লোবিন বাড়ানোর উপায়
এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ, কারণ সঠিক ব্যবস্থাপনায় অ্যানিমিয়া প্রতিরোধযোগ্য।
১) খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন
আয়রন সমৃদ্ধ খাবার:
- গরুর মাংস
- লিভার
- ডিম
- ডাল
- ছোলা
- সয়াবিন
- পালংশাক
- বিট
- গুড়
- চিনাবাদাম
Vitamin C সমৃদ্ধ খাবার আয়রন শোষণে সাহায্য করে:
- লেবু
- কমলা
- আমলকি
- টমেটো
খাবারের সময় Tea / Coffee কমাতে হবে, কারণ এতে Tannin থাকে যা আয়রন শোষণ কমায়।
২) সাপ্লিমেন্ট নেওয়া
গর্ভাবস্থায় সাধারণত চিকিৎসকরা দেন:
- Iron tablet
- Folic acid tablet
- Vitamin B12 tablet
নিজে থেকে ওষুধ না খেয়ে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
৩) পানি ও হাইড্রেশন
প্রতিদিন পর্যাপ্ত পানি পান RBC উৎপাদন ও রক্তপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক।
৪) ইনফেকশন প্রতিরোধ
- পরজীবী সংক্রমণ এড়ানো
- পরিষ্কার রান্না ও পানীয় গ্রহণ
- স্বাস্থ্যকর স্যানিটেশন
কখন চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে
- শ্বাসকষ্ট বৃদ্ধি
- অতিরিক্ত দুর্বলতা
- হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক
- রক্তক্ষরণ
- খাবার না খাওয়া
চূড়ান্ত কথা
গর্ভাবস্থায় হিমোগ্লোবিন কমে যাওয়া একটি গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা হলেও সঠিক খাদ্যাভ্যাস, সাপ্লিমেন্ট, নিয়মিত চেকআপ ও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসরণ করলে এটি প্রতিরোধ করা সম্ভব। মা এবং শিশুর নিরাপদ ভবিষ্যতের জন্য এই বিষয়টি সম্পর্কে সচেতন থাকা অত্যন্ত জরুরি।